গবেষণা

Black Hole Hunters প্রজেক্টে আমরা আপনাকে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির লক্ষ লক্ষ নিখোঁজ কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল খুঁজে পেতে আমাদের সাহায্য করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। TESS স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে, আমরা চাই আপনি নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা সময়ের সাথে কীভাবে পরিবর্তিত হয় সেই গ্রাফগুলো পর্যবেক্ষণ করুন এবং মহাকর্ষীয় মাইক্রোলেন্সিং (gravitational microlensing) নামক একটি প্রভাব খুঁজে বের করুন। এই লেন্সিং প্রভাবটি নির্দেশ করতে পারে যে কোনো একটি বিশাল ভরের বস্তু একটি নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করেছে—যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নক্ষত্রটির আলোকে বাঁকিয়ে এবং ঘনীভূত করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আমরা আশা করি এর মাধ্যমে অন্যথায় অদৃশ্য ব্ল্যাক হোলগুলোর অস্তিত্ব উন্মোচন করা সম্ভব হবে।

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর কী?

একটি নক্ষত্রের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে যে কয়েকটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তার মধ্যে একটি হলো ব্ল্যাক হোল। সব নক্ষত্রই কিন্তু ব্ল্যাক হোল হিসেবে শেষ হয় না; এটি নির্ভর করে নক্ষত্রটির ভরের ওপর। আমাদের সূর্যের মতো কম ভরের নক্ষত্রগুলো 'হোয়াইট ডার্ফ' বা শ্বেত বামনে পরিণত হয়। সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি ভরের নক্ষত্রগুলো নিউট্রন স্টার তৈরি করে। আর সূর্যের ভরের ২০ গুণ বা তার চেয়ে বড় নক্ষত্রগুলো থেকে তৈরি হয় ব্ল্যাক হোল।

এই তিন ক্ষেত্রেই অবশিষ্টাংশগুলো আগের নক্ষত্রের তুলনায় অনেক বেশি ঘন হয়। একটি হোয়াইট ডার্ফের ভর সূর্যের সমান হলেও আকারে এটি পৃথিবীর সমান। নিউট্রন স্টারের ভর সূর্যের ভরের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে এবং এটি মাত্র ১০ কিলোমিটার প্রশস্ত হয়। ব্ল্যাক হোলের ভরের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই, তবে অধিকাংশ ব্ল্যাক হোল সূর্যের ভরের ১০ গুণ এবং প্রায় ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের হয়ে থাকে।

ব্ল্যাক হোল খুব বিচিত্র বস্তু। উপরে যে ব্যাসার্ধের কথা বলা হয়েছে, তা কোনো ভৌত পৃষ্ঠ (surface) নয়; এটি কেন্দ্র থেকে এমন একটি দূরত্ব যেখানে মুক্তিবেগ ( escape velocity) আলোর বেগের সমান হয়। একেই সোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ (Schwarzschild Radius) বা ইভেন্ট হরাইজন (event horizon) বলা হয়। এর মানে হলো ব্ল্যাক হোল সত্যিই কালো, কারণ এর মাধ্যাকর্ষণ এতই শক্তিশালী যে আলোও এই সীমানার ভেতর আটকে যায়। ব্ল্যাক হোলের ভেতরে আসলে কী ঘটে, তা পদার্থবিজ্ঞান এখনও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। জেনারেল রিলেটিভিটি অনুযায়ী এর ভেতরের সবকিছু শূন্য আয়তনের একটি অসীম ঘন বিন্দুতে সংকুচিত থাকে। কোয়ান্টাম ফিজিক্সও এখনও পর্যন্ত এর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

ব্ল্যাক হোলের ভেতরটা রহস্যময় হলেও এর ঠিক বাইরের অংশে কী ঘটে, তা পদার্থবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে। ব্ল্যাক হোল তার পাশের নক্ষত্র থেকে উপাদান টেনে নিতে পারে, যাকে "অ্যাক্রিশন" (accretion) বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় উপাদানগুলো এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে তা থেকে এক্স-রে নির্গত হয়। যখন এরা কোনো কিছু টেনে নেয় না, তখন এরা প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকে। তবে কিছু সংকেত থেকে এদের খুঁজে বের করা সম্ভব।

গ্যালাক্সির লুকিয়ে থাকা ব্ল্যাক হোল

অনেক নক্ষত্রই একা থাকে না। প্রায়ই তারা জোড়ায় জোড়ায় থাকে যাকে "বাইনারি" সিস্টেম বলে। কখনও কখনও তারা আরও বড় গ্রুপেও থাকতে পারে।

যেসব নক্ষত্র ব্ল্যাক হোল তৈরির মতো যথেষ্ট বিশাল, তাদের অধিকাংশই বাইনারি সিস্টেমে থাকে। কিন্তু একটি নক্ষত্র যখন ব্ল্যাক হোল হওয়ার জন্য সংকুচিত হয়, তখন তার বাইরের স্তরগুলো সুপারনোভা বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে। প্রশ্ন হলো, এই বিস্ফোরণের সময় অন্য নক্ষত্রটির কী হয়?

হয়তো মনে হতে পারে সুপারনোভা বিস্ফোরণের ধাক্কায় অন্য নক্ষত্রটি ধ্বংস হয়ে যাবে অথবা ছিটকে দূরে সরে যাবে। কখনও কখনও তা ঘটেও, কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিস্ফোরণের ধাক্কার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। ফলে অন্য নক্ষত্রটি কেবল টিকেই থাকে না, বরং নক্ষত্র এবং নতুন ব্ল্যাক হোলটি একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে।

আমরা মনে করি গ্যালাক্সির বেশিরভাগ ব্ল্যাক হোল এই ধরনের বাইনারি সিস্টেমে (একটি নক্ষত্র ও একটি ব্ল্যাক হোল) থাকা উচিত। এমন প্রায় ৭০টি সিস্টেমের কথা আমরা জানি, যার প্রায় সবগুলোই আবিষ্কৃত হয়েছে কারণ ব্ল্যাক হোলটি নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি ছিল এবং সেখান থেকে গ্যাস শুষে নিচ্ছিল (accretion), যা থেকে স্পষ্ট এক্স-রে সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল। সমস্যা হলো, বেশিরভাগ ব্ল্যাক হোল সব সময় কিছু শুষে নেয় না। Gaia mission-এর নিখুঁত পরিমাপের কারণে কিছু শান্ত ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পাওয়া গেছে—কিন্তু মহাকাশে সব মিলিয়ে মোট ১ কোটিরও বেশি ব্ল্যাক হোল থাকা উচিত! এর মানে বিশাল সংখ্যক ব্ল্যাক হোল আমাদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে।

সেলফ-লেন্সিং: লুকানো ব্ল্যাক হোল খোঁজার একটি পদ্ধতি

আমরা যেসব ব্ল্যাক হোল খুঁজছি সেগুলো অদৃশ্য হতে পারে, কিন্তু এদের খুঁজে পাওয়ার কিছু কৌশল আছে। ব্ল্যাক হোল থেকে আলো বের হয় না ঠিকই, কিন্তু এরা এদের মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে চারপাশকে প্রভাবিত করে। এই প্রজেক্টে আমরা খুঁজছি মহাকর্ষীয় লেন্সিং নামক একটি প্রভাব।

যদি নক্ষত্র এবং ব্ল্যাক হোল এমনভাবে সারিবদ্ধ হয় যে ব্ল্যাক হোলটি মাঝেমধ্যে আমাদের এবং নক্ষত্রটির মাঝখান দিয়ে যায়, তখন ব্ল্যাক হোলের মাধ্যাকর্ষণ নক্ষত্রের আলোকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। এটি অনেকটা আতশ কাঁচের মতো কাজ করে এবং নক্ষত্রটিকে সাময়িকভাবে আরও উজ্জ্বল দেখায়।

চিত্র ১: যখন ব্ল্যাক হোল নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায় তখন আলো বিবর্ধিত হয়। এটি লাইট-কার্ভে একটি সুনির্দিষ্ট চূড়া তৈরি করে।

আর আমরা এটাই খুঁজছি! আমাদের কাছে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের ডেটা আছে যেখানে আমরা হঠাৎ উজ্জ্বলতা পরিবর্তন পরীক্ষা করতে পারি। কিন্তু এখানে আপনাদের সাহায্য প্রয়োজন—এই মাইক্রোলেন্সিং ঘটনাগুলো খুব বিরল এবং অন্যান্য কারণেও (যেমন ফ্লেয়ার বা পালসেশন) নক্ষত্র উজ্জ্বল হতে পারে। এই ভিড়ের মধ্য থেকে আসল ব্ল্যাক হোল খুঁজে পেতে আপনাদের সাহায্য দরকার।

আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন

আপনাকে যা করতে হবে তা হলো নিচের মতো কিছু সহজ গ্রাফ দেখা এবং সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট চূড়া বা 'পিক' (peak) আছে কি না তা আমাদের জানানো। এই গ্রাফগুলোকে বলা হয় লাইট কার্ভ (light curves), যা প্রতিটি পরিমাপের সময় নক্ষত্রটি কতটা উজ্জ্বল ছিল তা দেখায়। আমরা এমন সময়গুলো খুঁজছি যখন একটি নক্ষত্র হঠাৎ করে কিছু সময়ের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।

যখন আপনি এমন কিছু দেখবেন, গ্রাফে সেটি চিহ্নিত করুন। ভুল হওয়া নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না! আমরা প্রতিটি গ্রাফ বেশ কয়েকজন মানুষকে দেখাব এবং সবার উত্তর মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। ফলে ছোটখাটো ভুলগুলো শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যাবে।

একবার চূড়ান্ত তালিকা পেয়ে গেলে, আমরা সেগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত করব। প্রতিটি নক্ষত্রকে পরীক্ষা করার আরও নিখুঁত পদ্ধতি আছে (যেমন নক্ষত্রটি নড়াচড়া করছে কি না তা মাপা), যা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। তাই আপনার দেওয়া তালিকাটি আমাদের কাজ অনেক সহজ করে দেবে।

আপনি ভাবতে পারেন কম্পিউটারের বদলে আপনার সাহায্য কেন দরকার। সংক্ষেপে বললে, কম্পিউটার কিছু কাজে দক্ষ আর মানুষ অন্য কিছু কাজে। মানুষ এবং কম্পিউটারের কাজ মিলিয়ে আমরা এককভাবে যে কারও চেয়ে ভালো ফলাফল পেতে পারি। স্পষ্ট উদাহরণগুলো কম্পিউটার খুঁজে পেতে পারে, কিন্তু কঠিন বা সূক্ষ্ম সংকেতগুলো শনাক্ত করতে আপনিই সেরা। যা একটি কম্পিউটারের জন্য খুব কঠিন, তা আপনার জন্য হয়তো বেশ সহজ হবে।

আমাদের তথ্য বা ডেটা কোথা থেকে আসে

বর্তমানে আমরা যে তথ্যগুলো নিয়ে কাজ করছি তা মহাকাশভিত্তিক ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট বা TESS থেকে পাওয়া। ২০১৮ সাল থেকে TESS কক্ষপথে আছে এবং এর মূল কাজ হলো আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ (যাকে এক্সোপ্ল্যানেট বলা হয়) খুঁজে বের করা। গ্রহগুলো যখন নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন উজ্জ্বলতা সামান্য কমে যায়—এই পদ্ধতিতেই তারা গ্রহ খোঁজে। আমাদের পদ্ধতিটিও অনেকটা একই রকম, তাই TESS-এর ডেটা আমাদের কাজের জন্য একদম আদর্শ।

আমাদের তথ্য বা ডেটা কোথা থেকে আসে

বর্তমানে আমরা যে তথ্যগুলো নিয়ে কাজ করছি তা মহাকাশভিত্তিক ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট বা TESS থেকে পাওয়া। ২০১৮ সাল থেকে TESS কক্ষপথে আছে এবং এর মূল কাজ হলো আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ (যাকে এক্সোপ্ল্যানেট বলা হয়) খুঁজে বের করা। গ্রহগুলো যখন নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন উজ্জ্বলতা সামান্য কমে যায়—এই পদ্ধতিতেই তারা গ্রহ খোঁজে। আমাদের পদ্ধতিটিও অনেকটা একই রকম, তাই TESS-এর ডেটা আমাদের কাজের জন্য একদম আদর্শ।

TESS-এর তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করার আগে আমরা SuperWASP নামক একটি ভূপৃষ্ঠ-ভিত্তিক জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে একই ধরনের অনুসন্ধান চালিয়েছিলাম। TESS-এর মতো SuperWASP-ও একটি এক্সোপ্ল্যানেট অনুসন্ধান প্রজেক্ট ছিল যা ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। আমাদের SuperWASP অনুসন্ধানের ফলাফলগুলো এখনও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই তা প্রকাশিত হবে।